নওগাঁয় ৫টি উপজেলার আড়াই লাখ লোক পানি বন্দী, বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট, পানিতে ডুবে ৭জন শিশুর মৃত্যু

নওগাঁয় ৫টি উপজেলার আড়াই লাখ লোক পানি বন্দী, বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট, পানিতে ডুবে ৭জন শিশুর মৃত্যু

রায়হান আলম  ঃ নওগাঁয় ছোট যমুনা ও আত্রাই নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে হু হু করে পানি প্রবেশ অব্যাহত থাকায় এখন প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের আত্রাই নদীর ৬টি পয়েন্টে ও ছোট যমুনা নদীর কয়েকটি স্থানে রেরী বাধ  ভেঙে জেলার রানীনগর, আত্রাই ও মান্দা উপজেলার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এছাড়াও পোরশা ও সাপাহার উপজেলার পুর্নভবা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে মোট ৫টি উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের আড়াই লাধিক মানুষ এখন পানিবন্দি। এসব এলাকার সাড়ে ৪ হাজার হেক্টর জমির ফসল তিগ্রস্থ হয়েছে। ভেসে গেছে শত শত পুকুরের কোটি কোটি টাকার মাছ। বন্যা কবলিত এলাকার মানুষ এখন উঁচু স্থানে, সড়ক, বেড়িবাঁধ ও আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। এসব এলাকায় এখন বিশুদ্ধ পানি, শুকনা খাবারসহ গবাদি পশুর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।
এদিকে, আত্রাই নদীর ৬টি অংশে বাধঁ ভেঙে যাওয়ায় নওগাঁর মান্দা-আত্রাই,বান্দাইখাড়া-আত্রাই, নাটোর-সিংড়া-আত্রাই আঞ্চলিক সড়কে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এদিকে, নওগাঁর আত্রাইয়ে পানিতে ডুবে জমজ কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে উপজেলার আহসানগঞ্জ ইউনিয়নের শুকটিগাছা গ্রামে মোতাহারের জমজ মেয়ে হালিমা  (২) ও হাবিবা (২)।
নিহতের স্বজনরা জানায়, সন্ধ্যায় তারা একত্রে বাড়ির পাশে পুকুরের পাড়ে খেলছিল। একসময় তারা সবার অজান্তে পুকুরের পানিতে ডুবে যায়। দীর্ঘণ পর এলাকাবাসী খোজাখুজি করে তাদের মৃত উদ্ধার করে। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
নওগাঁর আত্রাই নদীতে ডুবে ভাই বোনের মৃত্যু হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তারা রোববার বিকেলে আত্রাই নদীর পানি দেখতে আসে দুই ভাইবোন। এসময় ইরান পানিতে পড়ে গেলে বড় বোন ইরা তাকে বাঁচাতে পানিতে ঝাপ দেয়। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে আত্রাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে সেখানে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। নিহতরা রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার নওদাপাড়া গ্রামের ইয়ানত আলীর ছেলে ইরান (৮) এবং ইরা (১৬)। আত্রাই থানার ওসি মোসলেম উদ্দিন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন।
অন্যদিকে জেলার বদলগাছি উপজেলার নতুন হাট এলাকায় দুপুরে ছোট যমুনা নদীতে ৪ বন্ধু গোসল করতে নেমে নদী পার হতে পারলেও পলক মাঝ নদীতে ডুবে যায়। পলক দশম শ্রেণীর এক ছাত্র। পলক বদলগাছি উপজেলার মাষ্টার পাড়া মহল্লার বাসিন্দা রতন কুমার মন্ডলের ছেলে। নিখোঁজের পর স্থানীয় লোকজন এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করলেও ওইদিন মৃতদেহ উদ্ধার করতে পারে নি। পরদিন ১কিমি: অদুরে নদীতে লাশ ভেসে উঠলে পাওয়া যায়।
নওগাঁর পোরশা উপজেলার যুগিডাঙ্গা ইসলামপুর গ্রামে পুকুরে ডুবে একই পরিবারের দু'জন শিশু মারা গেছে। নিহতরা হলো ইসলামপুর গ্রামের আবুল কালাম এর ছেলে জিহাদ হোসেন (৩) এবং একই পরিবারের আবু তাহের এর ছেলে আরাফাত হোসেন (২)।
নিহতদের পরিবারের সদস্যরা জানান, সোমবার বিকেলে জিহাদ ও রিফাত বাড়ির বাইরে খেলাধুলা করছিল। এর মধ্যেই সকলের অজান্তে তারা বাড়ির পার্শ্বের একটি পুকুরে ডুবে যায়। পরে অনেক খোঁজাখুঁজির পরে জানতে পেরে পুকুর থেকে দু'জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে জেলায় বন্যার পানিতে ডুবে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নওগাঁর আত্রাইয়ে বন্যার পানির শ্রোতে রেলওয়ে ব্রিজের উইংওয়াল ভেঙে যাওয়ায় এ রুটে ট্রেন চালাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। উইংওয়াল ভেঙে যাওয়ায় ব্রিজের মূল পিলারের মাটি সরে গেলে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে মঙ্গলবার সকালে।
জানা যায়, গত কয়েকদিন আগে আত্রাই নদীর উত্তর দিকে জাতআমরুল নামক স্থানে বাঁধ ভেঙে যাবার ফলে উপজেলার উত্তরের বিভিন্ন মাঠ ও গ্রাম পাবিত হয়। সেই সাথে উপজেলার আমরুলকসবা, দাঁড়িয়াগাথী, ঘোষপাড়া ও আহসানগঞ্জ এলাকার পানি প্রবাহিত হয় এ রেলব্রীজ দিয়ে। আত্রাই রেলওয়ে স্টেশনের দেিণ ২৫০ নং ব্রিজের উত্তর পার্শের উইংওয়ালটি ভেঙে যাবার ফলে ব্রিজটি হুমকির সম্মুখিন হয়ে পড়েছে। সংবাদ পেয়ে ওইদিন সকালেই শান্তাহার থেকে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন রেলের উর্ধতন উপসহকারী প্রকৌশলী আফজাল হোসেন। মূল ব্রিজটি যাতে ভেঙে না পড়ে এ জন্য তিনি সকাল থেকেই লোকবল নিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ করছেন। আপাতত বাঁশ, চাটাই এবং মাটি ভরাট দিয়ে কোন রকম ব্রিজটিকে রার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তারপরও এ ব্রিজের উপর দিয়ে ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ থেকে যাচ্ছে।
আত্রাই রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার ছাইফুল ইসলাম বলেন, ব্রিজের উইংওয়াল ভেঙে যাওয়ায় সংবাদ পেয়ে তাৎণিক বিষয়টি উর্ধতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেছি। সে অনুযায়ী তারা ব্রিজ রার কাজও শুরু করেছেন। উর্ধতন উপসহকারী প্রকৌশলী বলেন, তিগ্রস্থ ব্রিজটিকে সচল করতে আমরা সাধ্যমত চেষ্টা করছি। আমাদের কাজ শেষ হলে এটি আর ঝুঁকিপূর্ণ থাকবে না। এদিকে রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী এবং সহকারী প্রকৌশলীগণও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
এদিকে, জেলা প্রশাসক মো: হারুন অর রশীদ ৫টি উপজেলার বানভাসী মানুষদের কাছে গিয়ে তাদের খোজ খবর নেন এবং ভাঙ্গা বাধ পরিদর্শন করেছেন। তাতক্ষনিক ভাবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৫০ মে:টন চাল এবং নগদ ৩ লাখ টাকা ও দুই হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট বিতরন করেছেন। তিনি বলেন, ত্রানের কোন অসুবিধা নাই। পর্যাপ্ত ত্রান আছে। ধৈর্য্য ধরে বন্যা মোকাবেলা করার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান।