নওগাঁর নিয়ামতপুরে উদ্বোধনের ২ বছর পার হলেও আজও শহীদ মিনার আলোর মুখ দেখিনি

কেন্দ্রীয় ও সরকারী কলেজসহ প্রায় দু’শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোন শহীদ মিনার নেই

নওগাঁর নিয়ামতপুরে উদ্বোধনের ২ বছর পার হলেও আজও শহীদ মিনার আলোর মুখ দেখিনি

স্টাফ রিপোর্টার ঃ ফেব্রুয়ারী মাস আমাদের ভাষার মাস। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মাস। নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় দেশের বিভিন্ন স্থানের মত ২১ ফেব্রুয়ারী মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিভিন্ন কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারীভাবে বিভিন্ন কর্মসূচী ও বেসরকারীভাবে বিভিন্ন ক্লাব সংগঠনসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করা হয়েছে কিন্তু অবাস্তব হলেও এটাই সত্য রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের ৬৯ বছর পেরিয়ে গেলেও এই উপজেলায় কেন্দ্রীয়  শহীদ মিনার নেই। গত ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৯ শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার এমপির হাত দিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের সামনে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মানের উদ্বোধন করা হলেও প্রায় দুবছর অতিবাহিত হতে চলল তবুও আজ পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখিনি।

এমনকি উপজেলার সর্ব বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ামতপুর সরকারী কলেজেও আজ পর্যন্ত কোন শহীদ মিনার নেই। হাতে গোনা কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আজও কোন শহীদ মিনার নির্মিত হয়নি। ফলে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র/ছাত্রীরা ৫২’র ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। উপজেলার মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরেজমিনে তদন্ত করে জানা যায়, উপজেলা সদরসহ ৮টি ইউনিয়নে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কলেজ ২শ ৪টি সরকারী ও বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে কলেজ রয়েছে ৬টি (আলাদাভাবে) এবং স্কুলের সাথে কলেজ রয়েছে ২টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৪৪টি, প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১শ ২৮টি এবং মাদ্রাসা রয়েছে ২৬টি। শুধুমাত্র বালাতৈড় সিদ্দিক হোসেন ডিগ্রী কলেজে শহীদ মিনার রয়েছে বাঁকী কলেজগুলোতে আজও  শহীদ মিনার নির্মিত হয়নি। ৪৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১৪টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার আছে। বাঁকী ৩০টি বিদ্যালয়ে কোন শহীদ মিনার নির্মিত হয়নি। ১শ ২৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯টি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার আছে তাও ২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাথে যুক্ত থাকায়। উপজেলার ২৬টি মাদ্রাসার মধ্যে কোন মাদ্রাসায় শহীদ মিনার নির্মিত হয়নি। উপজেলার ২শ ৪টি শিা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ২৪টি শিা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মান করা হয়েছে। বাঁকী ১শ ৮১টি শিা প্রতিষ্ঠানে কোন শহীদ মিনার নির্মান করা হয় নাই।  ৮টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ভাবিচা, পাড়ইল এবং বাহাদুরপুর ইউনিয়ন পরিষদে শহীদ মিনার রয়েছে। বাঁকী হাজিনগর, চন্দননগর, নিয়ামতপুর (সদর), রসুলপুর এবং শ্রীমন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদে শহীদ মিনার নেই। অথচ ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারী  আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি পায় এবং ২০০০ সাল থেকে পৃথিবীর সব দেশে এ দিবসটি আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে  পালন করছে। ঠিক তখন উপজেলা প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে ভাষা শহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মান না হওয়ায় জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে নিমদীঘি কারিগরি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্য মজনু রহমান জানান, আমাদের শিা প্রতিষ্ঠানের কোন এমপিও নাই। কাস করার মত শ্রেণি ক নাই, সেখানে শহীদ মিনারের কথা চিন্তা করবে কে? তবে সুযোগ পেলে অবশ্যই শহীদ মিনার তৈরী করবো। গত কয়েকমাস হলো শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রকৌশল বিভাগ থেকে জরিপ করে গেছে শহীদ মিনার নির্মান করার জন্য। এখন পর্যন্ত কোন উত্তর পাই নাই উপজেলা সদরে প্রতিষ্ঠিত নিয়ামতপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, যা বর্তমানে সরকারী কলেজে রূপান্তরিত। কলেজে বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার ছাত্র/ছাত্রী অধ্যায়নরত। কর্তৃপ দাবী করে সর্ব বৃহৎ কলেজ, অথচ আজ পর্যন্ত কোন শহীদ মিনার নির্মান করা হয় নাই। অত্র নিয়ামতপুর সরকারী কলেজের উপাধ্য মমতাজ হোসেন মন্ডল বলেন, আর কয়েকদিন পর আমি দায়িত্ব গ্রহন করবো। আগামী বছরের ২১ ফেব্রুয়ারী আসার আগেই ইনশাল্লাহ আমাদের প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মান হয়ে যাবে। বটতলী কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ তারেক মাহমুদ বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠান নন এমপিওভুক্ত। সবেমাত্র একটি চারতলা ভীত বিশিষ্ট একতলা বিল্ডিং পেয়েছি। অর্থের অভাবে কোন শহীদ মিনার নির্মাণ করা যায় নাই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে অবশ্যই শহীদ মিনার থাকা আবশ্যক। মল্লিকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক নাজমুল হাসান জানান, শহীদ মিনারের পবিত্রতা রা করা আমাদের সম্ভব হয় না তাই নিজ উদ্যোগে শহীদ মিনার সম্ভব না।  চন্দননগর কলেজের অধ্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমার কাস রুমের সংকট দূর হয়েছে। সরকারীভাবে বিল্ডিং পেয়েছি। নওগাঁ জেলা শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রকৌশলী কয়েকবার মাপযোগ করেছে। বাউন্ডারী ওয়াল ও শহীদ মিনার নির্মান করার জন্য। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন খবর নেই। ২০ সালটি তো করোনা সংকটেই চলে গেল। এবার যেন সরকার শহীদ মিনার নির্মাণ করে দেয়। অথবা প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চিঠির মাধ্যমে নির্দেশ প্রদান করে দেন যেন নিজ অর্থায়নে শহীদ মিনার নির্মাণ করতে হবে। তিনি আরো বলেন, সরকার বিভিন্ন শিা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবছর সংস্কার ও ভবন নির্মানের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে অথচ যারা আমাদের মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়েছে তাদের স্মরণে শহীদ মিনার নির্মান করার জন্য একটি টাকাও বরাদ্দ করা হয় না। এমনটি নির্দেশনাও প্রদান করা হয় না। সরকারের উচিৎ বিদ্যালয় বা কলেজ ভবন নির্মান ব্যয় নির্ধারণ করার সময় একটি শহীদ মিনার এর অর্থ যুক্ত করা।  উপজেলার আমইল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মৃনাল চন্দ্র প্রামানিক বলেন, নতুন ভবন নির্মানের সময় তাদের নির্মিত শহীদ মিনারটি ভেংগে ফেলা হয়েছিল। নিজ অর্থায়নে পুনরায় আমরা শহীদ মিনার নির্মাণ করেছি।  
উপজেলায় সরকারীভাবে কোন শহীদ মিনার নাই। নিয়ামতপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে নির্মিত তাদের শহীদ মিনারে রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদ দিবস ও আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করা হয়। নিয়ামতপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজেও কোন শহীদ মিনার নাই। 
উপজেলা নির্বাহী অফিসার জয়া মারীয়া পেরেরা কেন্দ্রীয়ভাবে শহীদ মিনার নির্মাণ প্রসঙ্গে বলেন, যেহেতু উপজেলা কমপ্লেক্স নির্মাণ হচ্ছে,  নির্মাণ কাজ শেষ হলেই কোন জায়গায় শহীদ মিনার সুন্দর মানানসই হবে সেই জায়গায়  অবশ্যই শহীদ মিনার নির্মাণ করা হবে। জায়গা না থাকার কারণে এতদিন শহীদ মিনার নির্মাণ করা যায় নাই। বালাতৈড় কলেজে খুব শীঘ্রই শহীদ মিনার নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্থ স্থাপন করা হবে। তিনি উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার প্রসঙ্গে বলেন, ২০২০ সাল তো করোনা সংকটেই চলে গেল। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। করোনা সংকট দূরে হলেও সরকার অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহন করবেন। উপজেলা মাধ্যমিক শিা অফিসার আব্দুস সালাম বলেন, শহীদ মিনারের জন্য সরকারীভাবে কোন বরাদ্দ হয় না। উপজেলা পরিষদ থেকে সিদ্ধান্ত নিলে প্রত্যেক বিদ্যালয়ে প্রধানকে চিঠি দিবো নিজ নিজ তহবিল থেকে শহীদ মিনার তৈরী করার জন্য। যখন কোন বিদ্যালয়ে নতুন বিল্ডিং নির্মাণ করা হবে তখন সেই ঠিকাদারের কাছ থেকে নিজ উদ্যোগে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করে নেওয়া যেতে পারে।  উপজেলায় ৪৪টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১২টি বিদ্যালয়ে ১টি মাদ্রসা ও ১টি কলেজে শহীদ মিনার রয়েছে। বাঁকীরা তাদের অর্থের অভাবে শহীদ মিনার তৈরী করতে পারে নাই। তবে খুব শিঘ্রই শহীদ মিনার তৈরী করার জন্য জোরালোভাবে নির্দেশ দেওয়া হবে।