ঐতিহাসিক ১৮ই ডিসেম্বর নওগাঁ হানাদার মুক্ত দিবস

ঐতিহাসিক ১৮ই ডিসেম্বর নওগাঁ হানাদার মুক্ত দিবস

মামুন পারভেজ হিরা,নওগাঁ ঃ

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় এলেও নওগাঁ হানাদার মুক্ত হয় ১৮ ডিসেম্বর।
৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর ২৬ মার্চেই নওগাঁয় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের প্রথম ডেপুটি স্পিকার এ্যাড. বয়তুল্লাহকে(এনএনএ) আহ্বায়ক নির্বাচিত করা হয়। এ পরিষদে অন্যান্যের মধ্যে অন্যতম সদস্য ছিলেন সি.এন.সি জেনারেল জালাল হোসেন চৌধুরীর, মোঃ আব্দুল জলিল, আ ন ম মোজাহারুল হক (ন্যাপ ভাসানী), এমএ রকীব (ন্যাপ মোজাফফর), আকতার আহাম্মেদ সিদ্দিকী, একেএম মোরশেদ প্রমূখ। নওগাঁ কেডি উচ্চ বিদ্যালয়ে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের কার্যালয় স্থাপিত হয়। এখানে বসেই সব ধরনের কর্মসূচী গ্রহণ করা হত। নওগাঁ ছিল ইপিআর ৭ নং উইং এর হেড কোয়ার্টার।
২৫ মার্চ কালো রাতে পাকবাহিনী রাজশাহী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা শুরু করে। ২৬ মার্চেই নওগাঁ সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ার শপথ গ্রহণ করে। ২৫ মার্চে ঢাকা সহ দেশের বহু এলাকা পাক হানাদারদের আক্রমণের শিকার হলেও নওগাঁ মুক্ত ছিল প্রায় এক মাস।
২১ এপ্রিল নাটোর থেকে অগ্রসরমান পাকহানাদার বাহিনী নওগাঁ দখল করার আগে সান্তাহার রেল জংশনের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ নগর’ নামে নামকরণ করে। এখানে ২৬ মার্চের পর বিহারি ও বাঙালীদের মধ্যে সংঘটিত সহিংস ঘটনায় বহু বিহারি প্রাণ হারায়। এই দিনেই দুপূর ১২ টার দিকে বিনা বাধায় হানাদার বাহিনী নওগাঁয় প্রবেশ করে এর নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করে। ২২ এপ্রিল পাকবাহিনীর অপর একটি কনভয় ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রাজশাহী থেকে সড়ক পথে নওগাঁয় প্রবেশ করে। তাদের নির্দেশ মতো ঐদিন রাতে পাকিস্তান রক্ষার লক্ষে শান্তি কমিটি গঠন করে।
এ সময় মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আব্দুল জলিলের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্ত পার হয়ে ভারতে অবস্থান নেন। প্রবাসী মুজিবনগর সরকার সমগ্র বাংলাদেশটিকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে। ৭ নম্বর সেক্টরের অধীনে নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, হিলি, রাজশাহী, পাবনা ও নাটোর অঞ্চল। এই সেক্টরের প্রথম দিকে ক্যাপ্টেন গিয়াস, পরবর্তীতে মেজর নজমুল হক এবং মেজর নজমুল হকের মৃত্যুর পর মেজর নূরুজ্জামান ছিলেন এই সেক্টরের অধিনায়ক। দেশের অভ্যন্তরে প্রেরিত মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ পরিকল্পনা রচনা, তাদের ব্যয়ভার, রসদপত্র সরবরাহের বিষয়ে মোঃ আব্দুল জলিল তত্ত্বাবধায়ক ও সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সমগ্র দেশে ১১টি সেক্টরে ১১৪ জনকে ভারতের দেরাদুন কাবুলিয়ায় সিএন্ডসি স্পেশাল কমান্ড প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এদের মধ্যে নওগাঁর দুই কৃতি সন্তান জালাল হোসেন চৌধুরী ও আখতার আহমেদ সিদ্দিকী প্রশিক্ষণ শেষ করেন।
এ ছাড়াও যারা স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা লগ্নেই নওগাঁর যেসব ছাত্র-যুবক মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন তাদের মধ্যে ছিলেন, মোখলেছুর রহমান রাজা, আফজাল হোসেন, মুনির আহমেদ, আব্দুল মালেক, আবু রেজা বিশু, আুনিসুর রহমান তলফদার, মোজাজামেল হক, মকলেছুর রহমান চৌধুরী, শামসুল হক, ওহিদুর রহমান, হাসেম আলী, ময়নুল ইসলাম হক মুকুল, খায়রুল আলম, শফিকুল ইসলাম খান, আব্দুস সাত্তার মল্লিক, হাফিজুর রহমান, আব্দুল ওহাব,আব্দুর রাজ্জাক, মোয়াজ্জেস হোসেন, জহুরুল ইসলাম ইদুল, হারুন-অল-রশীদ, আকতারুজ্জামান রঞ্জু, অনিমেশ চন্দ্র দাস, সিরাজুল ইসলাম আনসারী, মোর্শেদ তরফদার, আলমগীর নবাব সিদ্দিকী, জুলফিকারুল ইসলাম নার্গিস, আজাদ, জহুরুল ইসলাম স্বপন, এবিএম ফারুক, মকসেদ আলী, ডাঃ শাহ আব্দুল খালেক, হাবিলদার গোলাম রব্বানী মুকুল, এসএম সিরাজুল ইসলাম, আবু বক্কর সিদ্দিক, আবুল হোসেন প্রমূখ।
১০ডিসেম্বর ১৯৭১সালে রাণীনগর থানা হানাদার মুক্ত হয় এবং ১২ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে সান্তাহার হানাদার মুক্ত হয়। এর ফলে নিরাপত্তাজনিত কারণে পার নওগাঁয় বসবাসকারী সকল অবাঙ্গালীরা ১৪ ডিসেম্বরের রাতের মধ্যে স্বপরিবারে নওগাঁ কেডি স্কুলে আশ্রয় নেয়। এসময় হানাদার বাহিনীর নওগাঁ ক্যান্টনমেন্ট এলাকা(কেডি স্কুল), সাবেক থানা চত্বর, আদালত পাড়া ও এসডিও বাসভবন চত্বরে (বর্তমান কেডির মোড় থেকে ডিসির বাসভবন) আত্মরক্ষামূলক প্রতিরক্ষা বেষ্টনী গড়ে তোলে। ফলে ১৫, ১৬ ও ১৭ ডিসেম্বর শাখা যমুনার পূর্ব অংশ অর্থাৎ পার-নওগাঁ এলাকায় এই তিন দিন জনমানবশূন্য ছিল।
১৭ডিসেম্বর ১৯৭১সালে শীতের সকালে জালাল বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা শহরে প্রবেশ করতে চাইলে তাদের নিকট পাক সেনারা আত্মসমর্পন করবে না ঘোষণা দেয়ায় চারদিক থেকে মুক্তিযোদ্ধারা নওগাঁ শহর আক্রমণ করে। সকাল থেকে রাত্রী ৮টা পর্যন্ত উভয় পক্ষে প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে হানাদার বাহিনী ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে। এ যুদ্ধে ৫জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ক্যাপ্টেন গিয়াস অপেক্ষা করছিলেন নওগাঁ শহরে পাক আর্মিদের স্যারেন্ডার করানোর জন্য।
পরিশেষে ১৮ ডিসেম্বর সকালে বগুড়া থেকে অগ্রসরমান ভারতীয় মেজর চন্দ্রশেখর, পশ্চিম দিনাজপুর বালুরঘাট থেকে নওগাঁ অভিমুখে অগ্রসরমান পিবি রায়ের নেতৃত্বে মিত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী নওগাঁয় প্রবেশ করে। হানাদার বাহিনীর তখন আর কিছু করার ছিল না। ফলে প্রায় দুই হাজার পাক সেনা নওগাঁ কেডি স্কুল থেকে পিএম গার্লস স্কুল ও সরকারী গার্লস স্কুল পর্যন্ত শুরু করে রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে মাটিতে অস্ত্র রেখে আত্নসমর্পণ করে।
নওগাঁর বীরমুক্তিযোদ্ধারা বিজয় উল্লাসে “জয় বাংলা জয় বাংলা ” ধ্বনি দিতে দিতে এসডিও অফিস চত্তরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন এবং উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধারা জাতীয় পতাকার প্রতি সালাম জানিয়ে সম্মান প্রদর্শন করেন। সেই থেকে নওগাঁ হানাদার মুক্ত ১৮ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করা হয়। এ দিনটিকে ঘিরে জেলার বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন নওগাঁ হানাদার মুক্ত দিবস পালন করে আসছে।